একটুখানি বৈশাখ

পহেলা বৈশাখ, ১৪১৮

মুখবন্ধ:
কিছু জ্ঞানী মানুষ খুব লাফালাফি করতেছিল, ভোর ৬ টার আগে নাকি পহেলা বৈশাখ হয় না। আমি এইটার প্রতিবাদ করছি না। গুরুজনেরা যা বলেছেন, হয়ত ঠিকই বলেছেন। তাহলে পরদিন ভোর ৫.৫৯ পর্যন্ত পহেলা বৈশাখ, খিক খিক। সুভম! সুভম!

বিস্তারিত:
সবার মত আমিও চেষ্টা করছিলাম ঘুরেফিরে বেড়ানোর। রমনা, ডি.ইউ আগেই তালিকা থেকে বাদ দিয়েছিলাম, কারন আমার পরিচিত মানুষগুলো সব ধানমন্ডির দিকে। যাইহোক, সকাল মানে দুপুর ১১টার দিকে বাসা থেকে বের হয়ে বন্ধুদের সাথে দেখা করার উদ্দেশে্য বের হই। প্রথমে জাবিয়ার সাথে দেখা হয়, তারপর অর্নব। জাবিয়ার বাসায় দুপুরের খাওয়াটা মোটামুটি জোর করেই খাই। অতঃপর, নৌকাবাইচ দেখার জন্য আকুল আগ্রহ নিয়ে জাবিয়ার বুদ্ধিতে নির্ধারিত স্থান থেকে অনেক দূরে দাড়িয়ে থাকি। এবং যথারিতি নৌকাবাইচ আমাদের চোখের আড়ালেই সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন হয়। 😛
তারপর, দেখা হয় জোহান আর আহাদের সাথে। শুরু হয় boring সময় 😛 হুদাই দুনিয়াদারি হাটতেছি। একসময় আহাদ চলে গেলো। কিছুক্ষণ পর তারিন আসলো। খুব ভাব ব্যস্ত ভাব দেখায়ে চলেও গেলো। কি আর করা 😦 জোহানকে বললাম, তুই বাসায় যা, আমিও বাসায় যাই। তারপর, সিদ্ধান্ত নিলাম মোহাম্মাদপুর থেকে বাসে উঠব। রিক্সা ভাড়া অনেক বেশি চাওয়াতে হাটতে থাকলাম সামনের দিকে। ৩২ নম্বরের দিকে এসে বার্গার খাইতে ইচ্ছা হইল। বার্গার খেতে খেতে হঠাৎ ইচ্ছা হল, কোথাও গেলে কেমন হয়। জোহানকে বলা মাত্রই সে রাজি। (জোহান আর নায়েফ আগেও একবার এইরকম আকষ্মিক একটা যাত্রা করিয়াছে) তাই আমি বললাম নায়েফকে ফোন করতে। নায়েফ একটু মোচড়ামুচড়ি করলেও খুব সহজেই রাজি হয়ে গেল। তারপর নায়েফের বাসা।

সময়: আনুমানিক রাত ৯.৪৫
স্থান: কলেজ গেট

প্রথমে পাশের ছোটখাট বাস কাউন্টার গুলো থেকে জানতে চেষ্টা করলাম ৩/৪ ঘন্টায় কোথায় যাওয়া যায়। কোন কূলকিনারা না পেয়ে ভাবলাম ময়মনসিংহ যাব। মহাখালি থেকে প্রতি ৫ মিনিট পর পর বাস পাওয়া যায় এমন একটা অমূলক ধারনা নিয়ে একটা CNG তে করে মহাখালি বাস টার্মিনালে গেলাম এবং প্রায় জনশূন্য বাস টার্মিনাল আবিষ্কার করলাম। আবার কলেজগেট। যাত্রা স্থান ঠিক করতে পারতেছি না। এমন সময় আবার চোখে পড়ল হানিফের বাস সিলেট যায় (Light Bulb!) টিকিট বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করলাম, কতক্ষণে সিলেট যাওয়া যায়। বলে সাড়ে ৪ ঘন্টা। এর আগে পালাক্রমে আমি, জোহান আর নায়েফ সেই বিরক্তিকর প্রশ্নটা কয়েকবার করে ফেলেছি ‘ভাই, ৩/৪ ঘন্টায় কোথায় যাওয়া যায়?’ ফাইনালি, আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, সিট আছে? বলে শেষের তিনটা। আমি বললাম, তিনটা টিকেট দেন। লোকটা অষ্টম আশ্চর্য দেখার মত করে বলে, যাবেন? আমি বললাম, হ্যা। টিকেন দেন তিনটা। তারপর আর কি! বাসে উঠে সিলেট। হুররে!!!!

স্থান: মাজার রোড
সময়: আনুমানিক ভোর ৫ টা

কিছুক্ষণ ধরে নিরাপদ মুত্র বিষর্জনের জন্য জোহান আর নায়েফ হসপিটালের খোঁজাখুঁজি করল। এর মধ্যে আবার মাজারেও একবার হালকা ঢুঁ মেরে আসলাম।

Me
Me and Johan

আমার চা বাগান দেখার খুব ইচ্ছা হইল। ওরা বিজ্ঞের মত বলল, চা বাগান অনেক দূরে। আবার হাসাহাসিও করল। সিলেট গেছি এইটার প্রমাণ স্বরূপ ফটুক তোলা হল। কিছুদুর যাওয়ার পর জানতে পারলাম, চা বাগান আসলে অত বেশি দূরেও না। আমরা স্মার্ট, তাই অত্যন্ত বেশি ভাড়া দিয়ে একটা রিক্সা ঠিক করে চা বাগান দেখতে গেলাম। কিন্তু সত্যি কথা বলতে এইটা নিয়ে আফসোস নাই, কারন ওই সময়টুকু অনেক ভালো ছিল। অনেক ভঙ্গিমায় ফটুক তোলা হল।

Johan
Nayef

পকেটের অবস্থা খুব বেশি ভালো না। ব্যাংকের কোন বুথই কাজ করে না। পেট পূঁজা তখন সপ্নের মত। যাইহোক, DBBL (যাহা কখনই কাজ করে না, তাহা কেলেসমতি দেখাইলো) থেকে ৩০০ টাকা বের করলাম। একটা রেস্টুরেন্টের নাম খুব ভালো লেগেছিলো, ‘ইষ্টিকুটুম’, ওখানে সকালের খাওয়া শেষ করলাম।

Johan and Nayef
Me and Nayef

আবার মাজারে গেলাম। সব ঘুরে দেখার জন্য। আমাদের সবার অগচরে জোহান রহমান, পিতা: মুজিবুর রহমান, মাজারের অর্থ কোষাগারে কিছু অর্থ সংযোগ করার ক্ষিণ চেষ্টা করল, যাহা আমার চোখে ধরা পড়ল। 😛 😛
পুকুরের মাছ, কয়েন ফেলার কুয়া, কবুতর আরও অনেক কিছুই দেখলাম।

সময়: সকাল ৮.৩০
স্থান: হানিফ কাউন্টার, মাজার রোড

ফিরতি বাসের টিকেট নিয়ে বসে আছি এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা।

পরিশেষ:
এইছিল আমাদের AWESOME সিলেট ভ্রমণ with full of awesomeness 😀 😀

Review: যদি আমরা ধানমন্ডি থেকে ৫০ টাকা দিয়ে রিক্সায় উঠতাম!!

N.B টাইটেলটা জাফর ইকবাল স্যারের দুইটা বইয়ের মত। আমি চুরি করেছি বলতে পারেন। মাইন্ড করব না।

Advertisements

সমুদ্র দেখা এবং সমাজ তথা দেশ সেবা!!!

সমুদ্রের সাথে কথোপকথন:
রাত ১২টা ৪৫মিনিট। আকাশে বিশাল একখানা চঁাদ। এই সৌন্দর্য লিখে বর্ণনা করা যাবে না। সমুদ্রের পানিতে পা ভিজিয়ে হাটছি। তখন জোয়ার চলছে। কখনও কখনও একটু বড় ঢেউ এসে আমাদের হাঁটু পযর্ন্ত ভেজানোর চেষ্টা করছে, যেন সেও আমাদের সংগ দিচ্ছে। আমরা চার জন(আমি, অর্নব, তারেক আর সমুদ্রের ঢেউ) ঠিক এইভাবে হাঁটছি অনেকক্ষণ। ক্লান্তি বিহীন এই হাঁটার অভিজ্ঞতা অসাধারন।

সময়ে পরিভ্রমণ:
কিছুদিন থেকে কোথাও ঘুরতে যেতে খুব ইচ্ছা করছিল। কিন্তু কোথায় যাবো ঠিক করতে পারছিলাম না। আমার আসলে খুব বেশি দেশ ঘোরা হয় নাই। যদিও ইচ্ছা অনেক আছে। হঠাৎ করে খবর পাইলাম ভার্সিটি থেকে যাচ্ছে। কাহিনী কিছুই জানি না। তাও যাব এইটা ঠিক করে ফেললাম। খবর নিয়ে যা জানতে পারলাম, এইটা একটা International Organization, নাম Kewkradong. যাইহোক, আমি আর কিছু চিন্তা করলাম না, উত্তাল সমুদ্র দেখার নেশা মাথায় কঠিনভাবে চেপে বসেছে। মোটামুটি ৩ জন টাকা পয়সা জমা দিলাম যাওয়ার আগের দিন।

৯টা ৩০মিনিটে গাড়ি ছাড়ার কথা থাকলেও বাঙ্গালী নিয়মে কিছু বেশি সময় পরেই আমাদের বাস যাত্রা শুরু করল এবং সকাল ১১টার দিকে আমরা কক্সবাজার পৌছালাম। হোটেলে ব্যাগ রেখেই চলে গেলাম সাগর দেখতে।
অবশেষে, আমি সমুদ্রের সামনে। কিছুক্ষণ গোসল করলাম আর কতগুলো ৩৬০ ডিগ্রী চক্করের সাথে সাথে নাক-মুখ দিয়ে (ইচ্ছা না থাকা স্বত্বেও) সমুদ্রের স্বাদ নিলাম 😀 একটা টায়ার নিলাম বেশি মজা করার জন্য, মজা ঠিকই হলো, সাথে সাথে পানি গলধঃকরনের পরিমাণও বেড়ে গেল।
বিকাল হঠাৎ করে মহেশখালী যাব ঠিক হইল। যেই কথা সেই কাজ। ১৪ জন মিলে মহেশখালীর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। প্রথমে Easy Bike এ চড়ে নদীর ঘাট, তারপর Speed Boat এ করে মহেশখালী। জায়গাটা না দেখলে বোঝা যাবে না, বাংলাদেশে এমন যায়গাও আছে। সারি সারি গাছ, বিশাল মাঠের মত যায়গা। কিন্তু ব্যপার হচ্ছে জোয়ারের সময় এর পুরোটাই চলে যায় পানির নিচে। জোয়ার-ভাটার এই খেলা ঐখানে না থাকতে পারলে খুব সুন্দর করে বোঝা যাবে না
। মহেশখালীতে দেখার মত অনেক কিছুই আছে। বৌদ্ধমন্দির, তাঁতপল্লী সহ আরও অনেক কিছু। আমরা এই দুইটা দেখেছি। সব থেকে ভালো লাগছে যখন তাঁতপল্লীর তাঁতীদের কাছ থেকে শাল(চাদর) কিনলাম। সাধারনত এই সুযোগ পাওয়া যায় না। আজকাল তো জেলেরাও মাছ বিক্রি করতে আসে না, আর কোথায় তাঁতী। ফেরার পথে একটু ঝামেলাই হয়েছিল। কারন, ঐখানের মানুষজন বার বার বলছিল জায়গাটা একটু খারাপ, সন্ধ্যার আগে আগে চলে যেতে। তারপরও সন্ধ্যায় Speed Boat ভ্রমন ব্যপারটা exciting ছিল।

পরের দিন ছিল আসল প্রোগ্রাম, যার জন্য আমরা কক্সবাজারে। Coastal Clean Up. আমরা প্রথমে ব্যপারটাকে যতটা boring ভেবেছিলাম ব্যপারটা ততটাই মজার ছিল। স্কুলের অনেক ছেলেমেয়েদের নিয়ে আসা হয়েছিল। অনেকগুলো গ্রুপে ভাগ করে সবাইকে নিয়ে বীচ এর আবর্জনা পরিষ্কার করলাম। প্রথমে ফাঁকিবাজি করার ইচ্ছা ছিল, পরে সবার কাজ করা দেখে নিজেই উৎসাহ নিয়ে কিছুক্ষণ করলাম। কি কি তুললাম, সেইগুলো আবার একটা ফরমে লিখলাম। যাইহোক, পুরো ব্যপারটাতে ২ ঘন্টার মত সময় নিয়েছে। তারপর আবার সেই সাগরের পানিতে লাফালাফি 😀
দুপুর শেষ হবার আগেই আমরা রওনা হলাম ‘ইনানী বীচ’ এর উদ্দেশ্যে। যাওয়ার জন্য ‘চান্দের গাড়ি’র বদলে একটা Land Cruiser পাইলাম। ইনানী যাওয়ার সময়টা অনেক মজার ছিল। রাস্তার একপাশে পাহাড় আর একপাশে সমুদ্র। ইনানী বীচে পানিতে পা ভিজানোর সময় এক পিচ্ছি আমাকে বলে ‘আঙ্কেল, ওখানে যেও না, চোরাবালি আছে’ 😀 ব্যপার টা আমার কাছে অন্যরকম লাগছে, কারন সাধারনত আমি এই ডাকটা শুনে অভ্যস্ত নই।

The Land Cruiser
The Land Cruiser

ইনানী থেকে চলে আসলাম হিমছড়ি। ইনানী থেকে গাড়িতে ওঠার প্রায় সাথে সাথেই ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়। কিছুদূর আসার পর, হঠাৎ একটা যায়গায় এসে দেখি কোনো বৃষ্টি নাই। প্রকৃতি আবারও তাকে দেখে অবাক হবার সুযোগ করে দিল। হিমছড়ি গিয়ে অনেক দূর সিঁড়ি বেয়ে উঠলাম। কিন্তু বেশিক্ষণ থাকতে পারলাম না, কারন সময় শেষ হয়ে যাচ্ছিল। ওখান থেকে নেমে গেলাম ঝর্ণা দেখতে। ছোটবেলা থেকে শুনে আসতেছি এই অদ্ভুত ঝর্ণার কথা। দেখে চোখ জুরায়ে গেলো। আমি নিজের চোখে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, কিভাবে একটা পাহাড় থেকে এই রকম গতিতে অনবরত পানি পড়ছে।

পরিশেষ:
আসার সময় একটা সনদপত্রও পেলাম। কিন্তু, কিন্তু…আসার পথে রাস্তা ছিল পুরা ফাঁকা। মাত্র ১৮ ঘন্টা সময় লাগছে 😛 😛